শাহীরের জন্মদিন!

শারমিন: মন খারাপ!
সোহাগ: কিছুটা! হুমম, আসলে বেশীটা।
শারমিন: ধুর! আবারও সময় আসবে আমাদের দেশে সবার সাথে সময় কাটানর!
সোহাগ: হ্যা, কিন্তু শাহীরের এই বয়সটা, শিক্ষার এই সময়টা আর আসবে না, ওর এখনই জানা দরকার ছিল কে ওর দাদা-দাদী, নানা-নানী, ভাই-বোন! স্কাইপে, ভাইবারে দেখা যায়, সময়টা ছোয়া যায় না, আমি ছেয়েছিলাম ও যেন বুঝতে পারে ওর এই সময়টা, ছুতে পারে এই আবেগটা!
শারমিন: আমরা অন্যভাবে কিছু করব, যেন ও মনে রাখে সময়টা, যা ওকে বুঝতে শেখাবে না পাওয়া সময়টাকেও!

—আমাদের কথাপকোকথনের কিছু অংশ। আমাদের এবার দেশে যাওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘ চার বছর পর। এত দিন ধরে অনেক চেষ্টা করেও দেশে যেতে পারিনি। এবার যাবার জন্য অনেক বেশী প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু আবেগও ছিল অনেক বেশী। শাহীর হবার পর ওর ওকে ওর নানা নানী ছাড়া আর কেও দেখেনি। ওর দাদীর অপেক্ষার দিন আরও বেশী দিনের হয়ে গেল। ওর ভাই বোনের আনন্দের লাফ-ঝাপ কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এত কিছুর পেছনে একটাই কারন, আমার চাকরীর পূণ:নবায়নের ২ সপ্তাহ আগে জানতে পারলাম এবার আর নবায়ন আর নবায়ন হবে না। যতটা না খারাপ চাকরী না থাকার কারনে, তার থেকেও বেশী খারাপ লেগেছিল দেশে না যেতে পাবার জন্য! মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক, আর এই হবার জন্য আমাদের পথ আমাদের মত থেকে মানুষের মতই হয়। স্বপ্ন থেকে বাস্তবে নেমে মানুষ হবার জন্য এর থেকে ভাল পথ আর হয় না। চল পথ আবার পথের সন্ধান করি, পথে পথে!

লিখতে বসেছিলাম শাহীরের জন্মদিনে লুতুপুতু মার্কা কিছু লিখব, কিন্তু আমার জন্য লুতুপুতু মার্কা কিছু যেন কখনও হয় না। যা মনে আসে লিখতে থাকি, নিজের কথা বলার মত করে, আসলে লুতুপুতু করে বললে যদি কখনও আমার বংশধরেরা এই কথা পড়ে, আমাকেও তখন লুতুপুতুই ভাববে, মানুষ না! নিজের ঢোল আমার উত্তরপুরুষের জন্য পিটিয়ে গেলাম।চাকরী থাুকুক আর নাই থাকুক, আমি লুতুপুতু থাকব না এবং তোমরাও থেক না!

তাই বলে কিছু না করে তো বসে থাকা যায় না! দেশে না হোক, এখানে ওর জন্য তো কিছু করতে হবে। আসলে বলা উচিত আমাদের জন্য। ওর এখনও বোঝার তেমন ক্ষমতা হয়নি। এখানকার সবাইকে ডাকতেও ভাল লাগছে না। আমরা তিনজনে কিছু করব! কোথাও ঘুরতে গেলে ভাল হয়, যেতে পারি, কিন্তু না গেলে কি নয়, টেকের অবস্থাও খুবই খারাপ! ওর জন্মদিন মার্চের ৪ তার তারিখ, কর্মদিবসে আমার মত বেকার মানুষ ঘরে থাকলেও শারমিন তো আর থাকতে পারবে না। তবুও শারমিন ইচ্ছে করেই ৩ তারিখে ওর ল্যাবে যায় নি। ভালই হল! বিকেল ৫টাতে ওকে নিয়ে বের হলাম মকডং বাবল স্টোরীতে, একটা ফ্যামিলি চুল কাটার দোকান। রাস্তার পাশের দোকানে চুল কেটে এবং চা খেতে খেতে বড় হইছি। এইসব ভাবের দোকানের কি বুঝি! যাই হোক, নতুন করে কিছু করা, ওর চুলও অনেক বড় হয়ে গেছে , ৩ মাস কাটা হয় না। দোকানে ঢুকেই আমাদের পছন্দ হয়ে গেল। ওদের বসার হাইড্রোলিক চেয়ার সুন্দর সুন্দর গাড়ির মত। শাহীর আমাকে গাড়ি চালাতে দেখতে দেখতে বড় হয়েছে! ওর কাছে গাড়ি একটা প্রিয় জিনিষ। ৭ দাত বের করে হে হে করে হাসা শুরু করেছে। ঐ দিকে যে অন্য বাচ্চারা কাদছে, ওর কোন খেয়ালই নাই! ওর আন্টিগুলো (এইসব দোকানে আবার খালাম্মা বললে আবার মাইন্ড খাইতে পারে) ওর জামারঔপর স্পেস সুটের মত জিনিষ পড়িয়ে দিয়েছে, তাতে কার কি! আন্টরা চুল কাটছে ওর গাড়ি দুলছে, ওর হাতের খেলনা বাজছে মধুর সূরে ওর হাসির তালে তালে! এটা বলা হয় নি যে ওর চুল কাটার পরে আমিও ওরমত নকল বেকহাম কাট দিয়ে ফেললাম আমার চুলের! শাহীরের জন্মদিন বলে কথা!

শুধু চুল কেটে কি জন্মদিন পালন হয় নাকি! ঠিক আছে, পোলাও বিরিয়ানী না থাকুক, ওর প্রিয় পরোরো তো থাকুক! পরোরো ওয়ার্ল্ডে গিয়ে শাহীর মহাখুশি! ও কি বুঝতে পারছিল কি আজ ওর জন্মদিন! নাহ, পারার কোন কারনই নাই! বুকের চিনচিনে ব্যথার মত শুধু আমরাই পারছিলাম। আর কেও না! যেসব খেলা ৫ বছরের নীচের বাচ্চাদের জন্য নয়, ও সেসব জোর করেই খেলছে, আর আমরা গর্বিত বাংগালীর মত বলছি,” কোরিয়ান দেখেছো বাপু, বাংগালী পোলা দেখো নাই!” ঐ ইভেন্টের মধ্যে একটা ছিল সরাসরি পরোরো ও তার বন্ধুদের নাচ! আমি শাহীরকে ইচ্ছে করেই ছেড়ে দিয়েছি, দেখতে চেয়েছি ওর প্রতিক্রিয়া কি হয়! যা ভেবেছিলাম, ও স্টেজে পরোরো ও তার বন্ধুগুলোদের জাপটে ধরছে, আর সবাই হেসে উঠছে! হাসতে হাসতে বের হয়ে গেলাম ট্রেনে উঠাব ওকে। এখানেও বয়স হয়নি ওর। এক বছরের বাচ্চা একা বসবে ওরা ভাবতে পারছে না। আমরা রিকোয়েস্ট করার পর ওরা শাহীরকে একা উঠতে দিল। ও ট্রেন ছাড়তেই এত হাততালি দিচ্ছিল যে দেখে মনটাই ভাল হয়ে গেল, পোলাও-বিরিয়ানী-জাকজমক না হোক, আমার ছেলেকে আমরা হাসাতে পেরেছি ওর জন্মদিনে, এটাই বা কম কি!

ওর জন্মদিন আমরা শুরু করেছিলাম ওর জন্য স্পেশাল অর্ডার দেয়া একটা কেক দিয়ে। যেটা আমরা নিজ হাতে দোকানে গিয়ে বানিয়েছি, খেলনা খাবার যোগ্য পুতুলগুলো নিজেরা বেছে বেছে বসিয়েছি, নিজেদের মন ভরে একেছি, খারাপ আকাগুলো ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছি। নাহ, খুব একটা খারাপ হয় নি!

আল্লাহ যে কোন দিনকে সুন্দর করতে পারে!
চাকরী থাকুক আর আর নাই থাকুক!
পকেটে টাকা থাকুক আর নাই থাকুক!
ঘর ভর্তি মানুষ থাকুক আর নাই থাকুক!
আমাদের ভালবাসা আমরা ভাসাবই!

(লেখাটা প্রায় এক বছর আগের লেখা,
ছেলের জন্মদিনের পরে,
কিন্তু শেষ করা হয় নি,
আজ হল, অলস বাবা আমি,
১০ মাস লেগে গেল এবং
আরেকটা জন্মদিন সামনে কড়া নাড়ছে)

Advertisements

অস্থিরতা

অস্থিরতা মানে থমকে যাওয়া নয়, অস্থিরতা মানে সামনে আগানোর পথে পথ নিয়ে পথিক হওয়া। দিক না জানা শূণ্যতায় নিজের বিহ্‌বলতা যেমন অনিবার্য, ঠিক তেমনি ভবিষ্যতের অন্ধকারাচ্ছন্ন চাতাল থেকে ক্রমনির্যাসিত হয়েও অালোকবার্তাকেও সঠিক আংগিনায় পৌছুতেও কিছুটা সময় দিতে হয়! সময়কে সময় দেয়া,অসময়ে সতর্ক থাকা, এইতো জীবন! অর্থ,খ্যাতি, ভালবাসা, সব কিছুতেও ভাসাভাসি না হলেও যে আলোতে শান্তি পেতে মুখিয়ে থাকে মন!

তিক্ত তবুও শিক্ষনীয়!

সময় বদলায়, পারিপাশ্বিকতা বদলায়, তবুও মানুষ কি বদলায়! বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বেকার হয়ে ঘুরি, সম্বল ভায়ের দেয়া ৫০০ টাকা হাত খরচ আর আম্মার দেয়া আরও কিছু টাকা। বেকার মানুষের জন্য এটা বেশী বেকি কম নয়! আড্ডায় সিগারেট (তখন খেতাম) ও চায়ের খরচ এবং মাঝে মাঝে ইন্টারনেটের বিল, চলে যেত ভালই! বেকার মানুষ হিসেবে আমি প্রতিনিয়ত খুজতাম কি করে সময়টাকে আরও মজার করে নেয়া যায়! আমি স্বপ্ন দেখতাম, কল্পনায় রংতুলি দিয়ে ছবি আকতাম, আর ভাবতাম আমিও একদিন………। Continue reading

শুভ বিজয়া!

সুন্দর হলেই যে ভাল লাগতে হবে, বা এটাই হওয়া উচিত তা কিন্তু নয়। অসুন্দর কি বাহ্যিক হয়, তাহলে বলতে হয় আমি সৌন্দর্য কি বুঝিই না! লোকে বলে নারীর সৌন্দর্য নাকি গুনে, কিন্তু মানুষ রুপের দিকেই এমন হা হয়ে তাকিয়ে থাকে যে গুন বলতে কিছু আছে তা বোঝাই ভার। কিন্তু আমিও বলি ভাই, শুধু নারীই নয়, পুরুষের সৌন্দর্যও গুনে, স্মার্ট বানচভংগির রংগ চটা ডেনিম জিন্স পড়া ৬ ফুটি যুবকের মধ্যেই আছে, তা কিন্তু ১০০ ভাগ বলা ঠিক নয়। ভাই, মাফ চাই, আপনিও যদি ৬ ফুটির সুঠাম পায়ের ডেনিম জিন্সের দিকেই তাকিয়ে থাকেন, তাহলে বলতেই হবে, পা আর ডেনিম জিন্স ধুয়া পানি খেতে পারেন, তবুও হা করা মুখটা বন্ধ করুন! এটা মানতে দোষের কিছু নাই, সুদর্শন আর সুদর্শনাকে সবাই পছন্দ করে, কিন্তু তাদেরকেও ভালবাসা পেতে হলে অন্তরের সৌন্দর্যটাই দেখাতেই হয়, সিল্কি শাড়ির আচল আর সুঠাম-ডেনিম-পা দেখালেই হয় না। আর অসুন্দর হইলেই যে মানুষ সুন্দর মনের হয়ে যায়, তাও কিন্তু নয়! যে সুন্দর সে হাজার কাল হলেও সুন্দর, মুখে হাজার ব্রণ থাকলেও সুন্দর। কারন আমি যে আমি সুন্দর মনটাকেই আগে ভালবাসি!

শুভ বিজয়া! বিজয় হোক শুভ’র….না না শুভ ভাইয়ের কথা বলছি না, মনের শুভ্রতার বিজয়ের কথা বলছি!

একা একা দিনগুলিতে আমি ও শাহীর!

শারমিন গত ৫ দিন হল বাসায় নাই! আমেরিকা গেছে কনফারেন্সের জন্য। এই কয়দিন শাহীর’কে একা একা রাখা যে কি ভয়ংকর এবং কঠিন অভিজ্ঞতা তা যদি আগে হত তাহলে পাগল হয়ে যেতাম। আসলে বাবা হবার আগে বুঝতামই না বাবা হবার কি দায়িত্ব। বাচ্চা আমি ছোটবেলা থেকে পছন্দ করি, বাচ্চারাও আমাকে করে। কিন্তু ছোট বাচ্চাকে পছন্দ করা আর তার সকল দায়িত্ব নেয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যপার। Continue reading

দেশে যাওয়া—কিছু কথপকথন~

বন্ধুত্বে কখনও হিসাব করতে হয় না কিংবা তা শর্তের মাঝেও চলা উচিত নয়। আমি গত মে মাসে ২৩ তারিখে দেশে গিয়েছিলাম আমার মায়ের ও শ্বশুরের শরীর খারাপ ছিল বিধায়। সাথে ছিল আমার ১৫ মাসের ছোট ছেলেটা। ওর মায়ের অনেক কাজের ব্যস্ততা ছিল, তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাবার ক্যানসারের অপারেশনের সময়টায় দেশে থাকতে পারে নাই। ক্যানসার ও মৃত্যু যে কত কাছাকাছি, তা মনে ডাক্তার আর আমরা যারা এই বিষয়ে কাজ করি তারা ভালই জানি। তারপরও আমরা সব ভয়কে দূর করতে বদ্ধপরিকর। শারমিন একেতো মেডিকেল ডাক্তার এবং পিএইচডি ডিগ্রীধারী, যার অনেক কাজই এর সাথে সামন্জস্য রেখে করতে হয়। হাজার চোখের জলের পরও ও যখন বাবার এই সময়ে যেতে পারে না, তার বেদনা তার থেকে অন্য কারও ভাল বোঝার নয়। মানুষ কতটা অসহায় হলে মা হয়ে নিজের ১৫ মাসের ছোট ছেলেটা কে বাবার সাথে ভিন দেশে পাঠিয়ে দেয়, যে দেশের আলো-বাতাস-মাটি-রোগ জীবানু কিছুই ছেলের অপরিচিত, এমনকি দেশের খাদ্যাভাসের সাথেও ও পরিচিত নয়, পানির সাথে নয়, এমনকি স্কাইপে দেখা মানুষ গুলোর গায়ের গন্ধের সাথেও নয়! Continue reading

ডেইলী মেইলের একটা খবর!

আজকে ডেইলী মেইলের একটা খবর দেখে মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেল। খবরে মা তার বাচ্চার কাছে বিভিন্ন সময়ে অনেক কিছু করতে পারা স্বত্তেও না করার জন্য ক্ষমা চেয়েছে। খবরটা যতটা না ক্ষমা চাওয়ার তার থেকে বেশী শারিরীকভাবে ক্লান্ত ও অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল মায়ের আকূতি ফুটে উঠেছে! Continue reading